মেনু নির্বাচন করুন

সিলেটের শীতল পাটি-বিশ্ব ঐতিহ্য

সিলেট এর শীতল পাটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের শীতল পাটি বুননের ঐতিহ্যগত হস্তশিল্পকে কে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নিবর্স্তুক বা ইনট্যানজিবল (Intangible) সাংস্কৃতিক ঐতিহ‌্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এ প্রস্তাবটি প্রণয়ন করেছিল ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ইউনেসকোর কাছে প্রস্তাবটি দাখিল করেছিল। স্বীকৃতিদানের মূল কাজটি করে ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিটি ফর দ্য সেফগার্ডিং অব দ্য ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ।

শীতল পাটি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প। মুর্তা বা পাটি, বেত বা মোস্তাক নামের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছাল থেকে এ পাটি তৈরি হয়। হস্তশিল্প হিসেবেও এ পাটির যথেষ্ট কদর রয়েছে। বিশেষ করে শুকনা মওসুমে মুর্তা থেকে বেত তৈরি হয়। বর্ষা মওসুমে দীর্ঘ সময় নিয়ে যত্নসহকারে বোনা হয় শীতল পাটি। শীতল পাটিতে কারিগররা দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন গান, কবিতা, জীবজন্তুসহ প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি।

শীতলপাটি নামের মধ্যেই রয়েছে এর গুণ। এই পাটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গরমে ঠান্ডা অনুভূত হয়। শীতলতার পাশাপাশি নানান নকশা, রং ও বুননকৌশল মুগ্ধ করে সবাইকে। প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়ার কারণে স্বাস্থ্যসম্মত এই পাটি। সিলেট জেলার বালাগঞ্জ শীল পাটির জন্য প্রসিদ্ধ। উপজেলার শ্রীনাথপুর, আতাসন, গৌরীপুর, লোহামোড়া, হ্যারিশ্যাম, কমলপুর ইত্যাদি এলাকায় শীতলপাটি তৈরি হয়। এসব শীতলপাটি বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন সিকি, আধুলি, টাকা, নয়নতারা, আসমান তারা ইত্যাদি। পাটিগুলো সাধারণত ৭ ফুট বাই ৫ ফুট হয়ে থাকে। সিকি খুবই মসৃণ হয়। কথিত আছে, সিকির ওপর দিয়ে সাপ চলাচল করতে পারে না মসৃণতার কারণে। সিকি তৈরিতে সময় লাগে চার থেকে ছয় মাস। আধলি মসৃণতা কম হয় এবং এর বুননে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। একটি আধলি তৈরিতে সময় লাগে তিন থেকে চার মাস। টাকা জোড়া দেওয়া শীতলপাটি দুই বা তার অধিক জোড়া থাকে টাকাতে। এগুলো অত্যন্ত মজবুত হয়। ২০ থেকে ২৫ বছরেও নতুন থাকে এই পাটিগুলো। এসব পাটির পাশাপাশি কিছু সাধারণ পাটি আছে, যা তৈরি করতে সময় লাগে এক থেকে দুই দিন। পাটির দাম নির্ভর করে সাধারণত বুননকৌশল ও নকশার ওপর। সর্বনিম্ন ২ থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে একেকটি পাটির দাম।

বৃহত্তর সিলেট শীতল পাটির জন্য প্রসিদ্ধ। সিলেটের চার জেলার সব ঘরে শীতল পাটি তৈরি হয় না বটে, তবে এর কদর ঘরে ঘরে। শীতল পাটির কাহিনি অনেক দীর্ঘ। ব্রিটিশ আমল থেকেই এর কদর। ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদে শীতল পাটি শোভা পেয়েছে। কিন্তু যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বিশ্বব্যাপী বাজারজাত করার মতো এমন একটি পণ্য আজ অবহেলিত। ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ (আইসিএইচ) কমিটি শীতল পাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় প্রায় হারিয়ে যাওয়া শীতল পাটি নিয়ে বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বে হৈ-চৈ পড়ে যায়। ফলে এর সাথে জড়িত পেশাজীবীদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শীতল পাটির বুনন ও এটি তৈরির প্রধান উপকরণ মুর্তার ব্যাপক চাষ করলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি আসবে ভিন্নমাত্রায়। শীতল পাটির কারিগর হিসেবেও অনেক বেকার পুরুষ-মহিলার কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভাটির জনপদে বর্ষার সময় কর্মহীন সময়কে কাজে লাগাতে পারে মুর্তা দিয়ে পাটি তৈরি করে। নানা ডিজাইনের শীতল পাটির কদর রয়েছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যে।


Share with :

Facebook Twitter